
দুর্যোগ পূর্বাভাস ও সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন মাইলফলক — চীনের সহযোগিতায় ৭০ কোটি টাকার প্রকল্প
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) দেশের প্রথম সমুদ্র স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে। “স্যাটেলাইট ওশান অবজার্ভেশন অ্যান্ড ডেটা ইনোভেশন সেন্টার” নামে পরিচিত এই কেন্দ্রটি উদ্বোধন করেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক রাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান অনুষদের সামনে গ্রাউন্ড স্টেশন উদ্বোধনের পর ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের অডিটোরিয়ামে একটি আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফরকান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ, ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আইয়ুব ইসলাম, দুই উপউপাচার্য, বাংলাদেশে চীনা দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কাউন্সেলর লি শাওপেং এবং চীনের সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফির ডেপুটি ডিরেক্টর অধ্যাপক ফু বিন।
প্রকল্পের পরিচিতি ও ব্যয়
প্রকল্পটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং চীনের সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফির যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়েছে। মোট ব্যয় প্রায় ৭০ কোটি টাকা, যার মধ্যে চীনা প্রতিষ্ঠানটি প্রযুক্তিগত ও যন্ত্রপাতি সহায়তায় প্রায় ৬০ কোটি টাকা অবদান রেখেছে। ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান অনুষদে এর নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
কার্যকারিতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ বিদেশি সংস্থার উপর নির্ভর করায় গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক তথ্য পেতে ২০ থেকে ৩০ ঘণ্টার বিলম্ব ঘটে। নতুন স্টেশনটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে বিস্তারিত উপকূলীয় তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।
স্টেশনটি বঙ্গোপসাগরের উপর দিয়ে পরিচালিত একাধিক সামুদ্রিক ও আর্থ অবজার্ভেশন স্যাটেলাইট থেকে তথ্য গ্রহণ করতে সক্ষম। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ও মেঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা আগে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরে সম্ভাব্য মৎস্য অঞ্চল চিহ্নিত করা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের লবণাক্ততা ও তাপমাত্রা বিশ্লেষণের মাধ্যমে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানেও কেন্দ্রটি সহায়তা করবে।
বক্তাদের প্রতিক্রিয়া
উদ্বোধনী আলোচনায় রাষ্ট্রমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের মতো একটি সামুদ্রিক দেশের জন্য সমুদ্র সম্পদের গভীর জ্ঞান ব্লু ইকোনমির বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে অপরিহার্য। উন্নত তথ্য সংগ্রহ ও আদান-প্রদান বিশেষত ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস আরও শক্তিশালী করবে এবং জানমালের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে এই কেন্দ্র জেলে সম্প্রদায় এবং মৎস্য খাতকে সময়মতো সমুদ্রের পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য মৎস্যক্ষেত্র সম্পর্কে তথ্য দিয়ে উপকৃত করবে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ কেন্দ্রটিকে বাংলাদেশের জন্য একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী অবস্থানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এই কেন্দ্র স্থাপন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কেন্দ্রের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবন, গবেষণা ও ব্যবহারিক প্রয়োগের উপর — শুধু প্রযুক্তির উপর নয় বলেও তিনি জোর দেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ মেরিন ডেটা হাবে পরিণত করতে “SGSMRS 2035 মাস্টার প্ল্যান” প্রস্তুত করা হচ্ছে। কক্সবাজারে একটি দ্বিতীয় ডেটা সেন্টার স্থাপন এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সংযোজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

